সকাল ৬:১৬, ১৬ই জানুয়ারি, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

শিরোনাম:

ভবনের আগুন নিভলেও জ্বলছে ক্ষোভের আগুন

ডেস্ক রিপোর্ট : রাজধানী ঢাকার অদূরে সাভারের আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুরের তাজরীন ফ্যাশন লিমিটেড কারখানায় দাউ দাউ করে জ্বলছিল আগুন। সেই আগুনে পুড়ে মারা গিয়েছিলেন ১১২ পোশাক শ্রমিক। আহত হন অসংখ্য শ্রমিক। আজ ২৪ নভেম্বর আট পেরিয়ে নয় বছরে পা রেখেছে সেই ট্রাজেডির দিন। এখনো পুড়ে যাওয়া হতদরিদ্র শ্রমিকদের স্মৃতি বয়ে বেড়াচ্ছে তাজরীন ফ্যাশন কারাখানার আটতলা ভবনটি। শুধু তাই নয়, ভবনটির আগুন তখনি নিভে গেলেও বিচারে দীর্ঘসূচিত্রা, ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন না পেয়ে স্বজন হারানো এবং আহত শ্রমিক পরিবারের সদস্যদের মনে এখনো জ্বলছে চাপা ক্ষোভের আগুন।
ভুক্তভোগী ২৫ পরিবার গত ৬৭ দিন ধরে (১৮ সেপ্টেম্বর থেকে) অধিকার আদায়ের জন্য জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন তাদের একজন তাজরীন ফ্যাশনের পাঁচতলার সুইং অপারেটর জরিনা বেগম।

তিনি বলেন, তাজরীন গার্মেন্টসের আগুনের ঘটনায় আমি আজ পঙ্গু। আমরা নায্য দাবি করছি। কিন্তু আমাদের সঙ্গে কেউ যোগাযোগ রাখছে না। কেউ কেউ এসে তালিকা নিয়ে যায়। কিন্তু কি কারণে তালিকা নেয়া হয় তা কেউই জানায় না।

আপ্লুত কণ্ঠে জরিনা আরো বলেন, আমার ঘর নেই। তাই পরিবার নিয়ে চলার মতো ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন এবং সুচিকিৎসার ব্যবস্থার নিশ্চয়তা পাওয়াই আমাদের মূল দাবি।

আগুন লাগার সময় গার্মেন্টেসর ভবনের চারতলা থেকে লাফ দেয়ায় গুরুতর আহত হয়েছিলেন সোলাইমান হোসেন। তিনি বলেন, ১৫ দিন আগে বিজিএমইএ ও শ্রম মন্ত্রণালয় থেকে আমাদের তালিকা নিয়ে গেছে। কিন্তু তালিকা দিয়ে তারা কি করেছে সে বিষয়ে আমরা কিছুই জানি না।

ভারাক্রান্ত মনে তিনি বলেন, ভবন থেকে লাফ দেয়ার পর মেরুদণ্ডে আঘাত পাই। একই সঙ্গে ডান পা ভেঙে যায়। সেই ক্ষত নিয়ে এখনো বেঁচে আছি।

ক্ষোভ প্রকাশ করে সোলাইমান হোসেন বলেন, নিজের খরচে চার বছর চিকিৎসা করিয়েছি। চার বছর পর কিছু টাকা পেয়েছিলাম। কিন্তু সেই টাকা চিকিৎসা ব্যয়ের চেয়ে অনেক কম। এখন নিহত ও আহতদের পরিবারকে সম্মানজনক ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা ও পুনর্বাসন করাই আমাদের দাবি।

এদিকে তাজরীন গার্মেন্টস কারখানার মালিকসহ আসামিরা বিচারের মুখোমুখি হয়েছেন ঠিকই, কিন্তু সবাই আছেন জামিনে। জানা গেছে, আদালতে দিনের পর দিন সাক্ষীরা হাজির হচ্ছেন না। তাই ঝুলে আছে মামলার অগ্রগতি। তাজরীন গার্মেন্টসের ঘটনার মামলায় কয়েকদিন পরপর নতুন করে শুধু শুনানির দিনই ধার্য হচ্ছে।

সর্বশেষ গত ১৫ অক্টোবর তাজরীন অগ্নিকাণ্ডের মামলার সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য ছিল। বিচারক উপস্থিত না থাকায় আদালত বসেনি। পরবর্তী শুনানির তারিখ আগামী বছরের ১৩ জানুয়ারি।

পরবর্তী ধার্য করা দিনে সাক্ষী হাজির করা সম্ভব হবে বলে উল্লেখ করেছেন তাজরীনের মামলার রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী এম এ মান্নান।

তিনি বলেন, সমন্বয়নের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি অন্য দায়িত্ব নিয়ে চলে যাওয়ায় মামলায় কিছুটা স্থবিরতা এসেছে। তবে নতুন একজনকে দায়িত্ব দিয়ে প্রসিকিউশন টিম করে দেয়া হয়েছে। আশা করছি, আগামী তারিখে আমরা সাক্ষী হাজির করতে পারব।

তিনি আরো বলেন, সাক্ষাীরা বেশিরভাগই গার্মেন্টেসের শ্রমিক। তারা ভাসমান থাকায় নিয়মিত যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। এতে সাক্ষ্যগ্রহণ কার্যক্রমে স্থবিরতাও এসেছে। মামলায় ১০৪ জন সাক্ষী এবং মামলার আসামি একাধিক। আসামিদের পৃথক আইনজীবী রয়েছে।তারা প্রত্যেকজন সাক্ষীদের জেরা করবেন। এতে অনেক সময় লাগবে।

তাজরীন ফ্যাশন লিমিটেডের কারখানায় নিহত ও আহতদের ক্ষতিপূরণের আইন পরিবর্তনের দাবি উঠেছে। এ ব্যাপারে শ্রম অধিদফতরের মহাপরিচালক এ এ এম মিজানুর রহমান সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, আইন পরিবর্তনের কাজ মন্ত্রণালয়ের। এটি একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া সেটিও মনে রাখা উচিত।

প্রসঙ্গত, ২০১২ সালের ২৪ নভেম্বর সন্ধ্যা ৭টার দিকে সাভারের তাজরীন ফ্যাশন লিমিটেড কারখানায় আগুন লাগার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় ১১২ জন পোশাক শ্রমিক পুড়ে মারা যান। আহত হয়েছিলেন অসংখ্য পোশাক শ্রমিকসহ বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তারাও। ওই ঘটনায় আশুলিয়া থানায় করা একটি মামলার তদন্ত করেন পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) পরিদর্শক এ কে এম মহসিনুজ্জামান খান। তিনি ২০১৩ সালের ২২ ডিসেম্বর ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম (সিএমএম) আদালতে তাজরীন ফ্যাশনের এমডি দেলোয়ারসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেন।

অভিযোগপত্রে বাকি আসামিরা হলেন- তাজরীন ফ্যাশনের চেয়ারম্যান মাহমুদা আকতার, প্রশাসনিক কর্মকর্তা দুলাল, স্টোর ইনচার্জ হামিদুল ইসলাম, আনিসুর রহমান, সিকিউরিটি গার্ড রানা ওরফে আনারুল, সিকিউরিটি সুপারভাইজার আল-আমিন, স্টোর ইনচার্জ আল-আমিন ও লোডার শামীম মিয়া।